অন্তরঙ্গ বন্ধু নির্বাচনে সতর্কতা!!!
'জালিম সেদিন নিজের দুই হাত দংশন করতে করতে বলবে, হায় দুর্ভাগ্য, আমি যদি অমুককে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করতাম।’ (সুরা : ফুরকান, আয়াত : ২৮)
বলা হয় বন্ধু ছাড়া আমাদের লাইফ ইম্পসিবল। সেই বন্ধু হওয়া চাই যথাযথ। তাই বন্ধু নির্বাচন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অন্তরঙ্গ বন্ধু যে কেউ হতে পারে। নিজের প্রভু, নবী সঃ, আত্মীয়, সহপাঠী, প্রতিবেশি যে কেউ।
যে বন্ধু হয় সে অন্তরে জায়গা করে নেয়। তার প্রতি একটা টান ও ভালোবাসা থাকে। তার বিশ্বাসের সাথে আপনার বিশ্বাসের মিল আছে। আমরা যদি বুঝিতে না পারি কাকে আমরা প্রিয় করবো আর কাকে ঘৃণা করবো, ভালোবাসতে কার নির্দেশনা মানবো, আর কাকে আমরা মেনে নিবো। বুঝতে না পারলে আমাদের জীবনের বড় ক্ষতিই হয়ে যাবে। কারণ, নিঃস্বার্থভাবে কেউ ভালোবাসে না। উদ্দেশ্য ছাড়া কেউ কিছু করেনা। স্বয়ং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ'লাও আমাদের একটা উদ্দেশ্য নিয়ে তৈরি করেছেন।
সুতরাং, তিনি কেন তৈরি করেছেন, তা জেনে-বুঝে ধৈর্যের সাথে মেনে নিলেই দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ ও সফলতা মিলবে। অন্যথায় ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্র, আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে মহা বিপর্যয় তৈরী হবে।
ভিন্ন-ধর্মী বা ঈমানের বিপরীত কেউ বন্ধু নয়ঃ
১. 'মুমিনরা যেন মুমিনদের ছাড়া কাফিরদেরকে বন্ধু না বানায়। আর যে কেউ এরূপ করবে, আল্লাহর সাথে তার কোন সম্পর্ক নেই। তবে যদি তাদের পক্ষ থেকে তোমাদের কোন ভয়ের আশঙ্কা থাকে। আর আল্লাহ তোমাদেরকে তাঁর নিজের ব্যাপারে সতর্ক করছেন এবং আল্লাহর নিকটই প্রত্যাবর্তন।' (Aal-e-Imran 3:28)
২. 'হে ঈমানদারগণ, তোমরা নিজদের পিতা ও ভাইদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না, যদি তারা ঈমান অপেক্ষা কুফরীকে প্রিয় মনে করে। তোমাদের মধ্য থেকে যারা তাদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করে তারাই যালিম।' (At-Taubah 9:23)
৩. 'হে মুমিনগণ, তোমরা তোমাদের ছাড়া অন্য কাউকে অন্তরঙ্গ বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। তারা তোমাদের সর্বনাশ করতে ত্রুটি করবে না। তারা তোমাদের মারাত্মক ক্ষতি কামনা করে। তাদের মুখ থেকে তো শত্রুতা প্রকাশ পেয়ে গিয়েছে। আর তাদের অন্তরসমূহ যা গোপন করে তা অধিক ভয়াবহ। অবশ্যই আমি তোমাদের জন্য আয়াতসমূহ স্পষ্ট বর্ণনা করেছি। যদি তোমরা উপলব্ধি করতে।' (Aal-e-Imran 3:118)
৪. 'হে মুমিনগণ, তোমরা মুমিনগণ ছাড়া কাফিরদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। তোমরা কি আল্লাহর জন্য তোমাদের বিপক্ষে কোন স্পষ্ট দলীল সাব্যস্ত করতে চাও?' (An-Nisa' 4:144)
৫. 'হে মুমিনগণ, ইয়াহূদী ও নাসারাদেরকে তোমরা বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। তারা একে অপরের বন্ধু। আর তোমাদের মধ্যে যে তাদের সাথে বন্ধুত্ব করবে, সে নিশ্চয় তাদেরই একজন। নিশ্চয় আল্লাহ যালিম কওমকে হিদায়াত দেন না।' (Al-Ma'idah 5:51)
৬. 'বল, ‘তোমাদের পিতা, তোমাদের সন্তান, তোমাদের স্ত্রী, তোমাদের গোত্র, তোমাদের সে সম্পদ যা তোমরা অর্জন করেছ, আর সে ব্যবসা যার মন্দা হওয়ার আশঙ্কা তোমরা করছ এবং সে বাসস্থান, যা তোমরা পছন্দ করছ, যদি তোমাদের কাছে অধিক প্রিয় হয় আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও তাঁর পথে জিহাদ করার চেয়ে, তবে তোমরা অপেক্ষা কর আল্লাহ তাঁর নির্দেশ নিয়ে আসা পর্যন্ত’। আর আল্লাহ ফাসিক সম্প্রদায়কে হিদায়াত করেন না' (At-Taubah 9:24)
৭. নবী ও মুমিনদের জন্য উচিত নয় যে, তারা মুশরিকদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করবে। যদিও তারা আত্মীয় হয়। তাদের নিকট এটা স্পষ্ট হয়ে যাওয়ার পর যে, নিশ্চয় তারা প্রজ্বলিত আগুনের অধিবাসী। (At-Taubah 9:113)
৮. নিজ পিতার জন্য ইবরাহীমের ক্ষমা প্রার্থনা তো ছিল একটি ওয়াদার কারণে, যে ওয়াদা সে তাকে দিয়েছিল। অতঃপর যখন তার নিকট স্পষ্ট হয়ে গেল যে, নিশ্চয় সে আল্লাহর শত্রু, সে তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করল। নিশ্চয় ইবরাহীম ছিল অধিক প্রার্থনাকারী ও সহনশীল। (At-Taubah 9:114)
হাদীসঃ
১. আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ মানুষ তার বন্ধুর রীতিনীতির অনুসারী হয়। কাজেই তোমাদের প্রত্যেকেই যেন লক্ষ্য করে, সে কার সঙ্গে বন্ধুত্ব করছে।[1]
হাসান।
[1]. তিরমিযী, আহমাদ। হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)
২. আবূ সাঈদ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তুমি মু‘মিন ব্যক্তি ব্যতীত অন্য কারো সঙ্গী হবে না এবং তোমার খাদ্য যেন পরহেযগার লোকে খায়।(1)
হাসান।
(1). তিরমিযী, আহমাদ। হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)
৩. সামুরাহ ইবনু জুনদুব (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ কেউ কোনো মুশরিকের সাহচর্যে থাকলে এবং তাদের সাথে বসবাস করলে সে তাদেরই মতো।(1)
(1). সহীহ। হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
৪. সুতরাং, আমরা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য মানুষকে ভালোবাসবো আর তার সন্তুষ্টির জন্য শত্রুতা করবো। মানুষ বলতে আমাদের পিতা-মাতা, আত্মীয় স্বজন, বন্ধু বান্ধব, পাড়া প্রতিবেশী সবাই, সমাজ, রাষ্ট্রের সকল মানুষকেই বুঝায়, এমনকি সারা বিশ্বের সকল মানুষও।
কাফিররা পরস্পর ভাই ভাই, কোরআন-হাদিসঃ
১. আর যারা কুফরী করে তারা একে অপরের বন্ধু। যদি তোমরা তা না কর (অর্থাৎ তোমরা পরস্পর পরস্পরের সাহায্যে এগিয়ে না আস) তাহলে দুনিয়াতে ফিতনা ও মহাবিপর্যয় দেখা দিবে। (সূরা আনফালঃ ৭৩)
২. হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, দুই মিল্লাতের লোকেরা পরস্পর ওয়ারিস হবে না। কোন মুসলিম কোন কাফেরকে ওয়ারিস করবে না। অনুরূপভাবে কোন কাফেরও মুসলিমকে ওয়ারিস করবে না। তারপর তিনি আলোচ্য এ আয়াত পাঠ করলেন। [মুস্তাদরাকে হাকিম; ২/২৪০; অনুরূপ; মুসনাদে আহমাদ; ৫/৩৫২; মুসলিম; ১৭৩১; বুখারী; ৬৭৬৪]
মুমিনরাও পরস্পর ভাই ভাইঃ
আয়াতসমূহ-
সরাসরি ঈমান ও আমলের বিরুদ্ধে না গিয়ে মুমিনদের কিছু বিষয়ে মতের অমিল থাকতে পারে। কিন্তু এই তুচ্ছ বিষয়ে মতের অমিল নিয়ে দলাদলি, মারামারি, হানাহানি করলে কঠিন শাস্তি জাহান্নামে রয়েছে। এমনকি পথভ্রষ্ট হয়ে তা ঈমান ভঙ্গের কারণও হতে পারে।
১. মহান অল্লাহরাব্বুল আলামিন এরশাদ করেন, ‘নিশ্চয়ই মুমিনগণ পরস্পর ভাই ভাই।’ (সুরা হুজরাত, আয়াত-১০)
২. ‘তোমরা সেইসব লোকদের মতো হবে না, যাদের কাছে স্পষ্ট ও প্রকাশ্য নিদর্শন আসার পরও তারা বিভিন্ন দল-উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়েছে এবং নানা ধরনের মতানৈক্য সৃষ্টি করেছে, তাদের জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তি।’ (সুরা আলে ইমরান-১০৫)
৩. আল্লাহতায়ালা আরো ইরশাদ করেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, সালাত কায়েম করো এবং কখনো মুশরিকদের দলভুক্ত হবে না, যারা তাদের দীনকে টুকরো করে দিয়েছে এবং নিজেরা নানা দলে বিভক্ত হয়েছে এদের প্রত্যেকটি দলই নিজেদের যা আছে তা নিয়েই মত্ত।’ (সুরা তাওবাহ, আয়াত -৩১,৩২)
৪. অন্যত্র ইরশাদ করেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমারা আল্লাহর রজ্জুকে আঁকড়ে ধরো এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না।’ (সুরা ইমরান, আয়াত-১০৩)
৫. আরো ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আমি তাদেরকে বেশি ভালোবাসি যারা আল্লাহর রাস্তায় এমনভাবে সারিবদ্ধ হয়ে লড়াই করে, ঠিক যেন শীসাঢালা এক সূদৃঢ় প্রাচীর।’ (সুরা সফ, আয়াত-৬১)
হাদিস সমূহঃ
১. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘মুমিনগণ একজন মানুষের মতো, যার চোখ আক্রান্ত হলে সমস্ত শরীর আক্রান্ত হয় আর তার মাথা আক্রান্ত হলে সমস্ত শরীর আহত হয়।’ (মুসলিম, হাদিস নং-২৫৮৬)
২. হজরত হারিছ আল আশআরী (রা.) থেকে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন, ‘আমি তোমাদেরকে পাঁচটি বিষয়ের নির্দেশ দিচ্ছি, স্বয়ং রব আমাকে এগুলোর নির্দেশ দিয়েছেন। বিষয়গুলো হচ্ছে: ১. সংঘবদ্ধ। ২. আমীরের নির্দেশ শ্রবণ। ৩. আমীরের নির্দেশ পালন। ৪. হিজরত। ৫. অল্লাহর রাস্তায় জিহাদ। যে ব্যক্তি সংঘবদ্ধতা ত্যাগ করে এক বিঘৎ পরিমাণ দূরে সরে গেছে সে নিজের গর্দান থেকে ইসলামের রজ্জু খুলে ফেলেছে। সাহাবিগণ জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! সালাত কায়েম এবং সাওম পালন করা সত্ত্বেও? উত্তরে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, নামাজ কায়েম এবং রোজা পালন এবং মুসলমান বলে দাবি করা সত্ত্বেও।’ (তিরমিযি, হাদিস নং-২৭৯০)
৩. রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘পারস্পরিক ভালোবাসা, দয়া, অনুগ্রহ, মায়া-মমতার দৃষ্টিকোণ থেকে তুমি মুমিনদের দেখবে একটি দেহের মতো। যদি দেহের কোনো একট অংশ আহত হয়ে পড়ে তবে অন্যান্য অংশও তা অনুভব করে।’ (বুখারি, হাদিস নং- ৬০১১)
৪. রাসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেন, ‘তোমরা ঐক্যবদ্ধভাবে জীবনযাপন করো, সংঘবদ্ধ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে জীবনযাপন করো না, কারণ বিচ্ছিন্ন হলে শয়তানের কুপ্ররোচনায় আকৃষ্ট হয়ে পথভ্রষ্ট হয়ে যাবে।’ (আবু দাউদ, হাদিস নং-১৯৩৬)
৫. রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘মুমিনগণ অপর মুমিনের জন্য একটি প্রাচীরের মতো, যার এক অংশ অপর অংশকে মজবুত করে। এরপর তিনি এক হাতের আঙুল অপর হাতের আঙুলে প্রবিষ্ট করেন।’ (বুখারি, হাদিস নং- ২৭২৫)
৬. হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘তিনজন লোক কোনো নির্জন প্রান্তরে থাকলেও একজনকে আমীর না বানিয়ে থাকা জায়েজ নয়।’ (আহমদ আল মুসনাদ, হাদিস নং-৬৩৬০)
৭. হজরত ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘যে ব্যক্তি সংঘবদ্ধ থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবে তার মৃত্যু হবে জাহেলিয়াতের মৃত্যু। (মুসলিম, হাদিস নং ৫২৯২)
৮. হজরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) থেকে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি জান্নাতের সর্বোত্তম অংশে বসবাস করে আনন্দিত হতে চায় সে যেন ঐক্যবদ্ধভাবে আল্লাহর রজ্জুকে আঁকড়ে ধরে।’ (তিরমিযি, হাদিস নং-১১২৬)
তাই আল্লাহ যেহেতু আমাদের তৈরি করেছেন, সুতরাং আমাদের কথায়, মনে, বাস্তবে তথা দৈনন্দিন কাজের সর্বক্ষেত্রে তার আইন মেনে নিলাম। আর তার আদেশ-নিষেধ অনুসারে চলা শুরু করলাম। এই নিয়তেই কল্যাণ।
বন্ধু হল আল্লাহ। আর আল্লাহর খুশীর জন্যই আমরা বন্ধুত্ব করবো। আবার তার খুশীর জন্যই শত্রুতা করবো। তাহলেই বন্ধুত্ব সার্থক ও সুন্দর হবে। কল্যাণ পাবো দুনিয়া ও আখিরাতের।
0 Comments