Search This Blog

মানুষের জীবনে সম্পর্ক ও তার বিভিন্ন দিক!!!

মানুষের জীবনে সম্পর্ক ও তার বিভিন্ন দিক!!!


 মানুষের জীবন সম্পূর্ণ স্বাধীন নয়। আমরা যতই স্বাধীনতার ঘোষণা দেই না কেন দায়িত্ব পালনের মধ্যেই মানুষের জীবন সীমাবদ্ধ।  শুধু তাইনা আপনি পরিশ্রম করলেই সুখি থাকবেন। ব্যালেন্স লাইফ পরিচালনা করার জন্য সবার প্রতি দায়িত্বশীল হতে হয়। আপনি অন্যের প্রতি দায়িত্বশীলতা দেখালে আপনার কাজ অনেক সহজ হয়ে যাবে! আবার শুধু আত্মাকেন্দ্রীক হলেও নিজেকে ভালো রাখার জন্য এবং নিজের ভালোর জন্য হলেও কিছু দায়িত্ব পালন করতে হয়। 

 


 

 

তাই আমাদের জীবন সুখী ও সুন্দর করার জন্য চাই যথাযথ নিয়ম কানুনের অনুসরণ। এই নিয়ম কানুনের অনুসরণই আমাদের নিজের প্রতি বা অন্যের প্রতি দায়িত্বশীল করে তোলে। এই দায়িত্বশীলতার ক্ষেত্রে অনেকের মধ্যে কাকে কতটুকু প্রাধান্য দিবো তা জানা আমাদের জন্য জরুরী তথা আবশ্যক। জানলে আমরা যথাযথ ভাবে চলতে পারবো। আর না জানলে সব এলোমেলো করে ফেলবো। এই বিষয়টা সবারই জানা দরকার যে, সৎ কাজে আনুগত্য হয়, আর অসৎ কাজে কোন আনুগত্য নেই। 

 

নিচে দেখা যাক কাদের প্রতি আমাদের সম্পর্কের অনুগত ও দায়িত্বশীল হতে হয়ঃ

১/ আল্লাহ (সুবহানাহু তালা)

২/ নবী সঃ

৩/ সৎ কর্মশীল নেতা 

৪/ পিতা-মাতা

৫/ আত্নীয়-স্বজন

৬/ জীবন সঙ্গী 

৭/ প্রতিবেশী 

৮/ বন্ধু 

৯/ অন্যান্যদের প্রতি


ব্যাখ্যা দেখা যাকঃ

১,২,৩/ আল্লাহ, নবী ও সৎ কর্মশীল নেতার আনুগত্যঃ আমাদের সর্বপ্রথম আল্লাহর আনুগত্য মেনে নিতে হবে। এরপর তিনি যাদের প্রতি আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন দায়িত্ব পালন করতে তা করতে হবে। 

আল্লাহর পরেই নবী সঃ এর আনুগত্য স্বীকার করে নিতে হবে। কারণ আল্লাহ আমাদের শুধু সৃষ্টি করেই ছেড়ে দেননি। আমাদের জন্য পাঠিয়েছেন নবী যিনি সৎ পথের সন্ধান দিয়েছেন। আর বারণ করেছেন অসৎ কর্ম হতে!

এরপরই সৎ নেতার আনুগত্য স্বীকার করে নিতে হবে। কারণ মানুষ হিসেবে সবারই চিন্তা আলাদা তাই সবারই মত আলাদা। সবাই সবার মত অনুযায়ী চললে বিশৃঙ্খলা আর অশান্তিই সৃষ্টি হবে। তাই নেতা যিনি অধিকাংশ বিষয়ে সঠিক পথের দিশারি হবেন আর তুলনামূলক সঠিক সিদ্ধান্ত নিবেন।

নিম্নে কোরআন ও হাদিসের রেফারেন্স তুলে ধরা হলঃ  

আনুগত্য সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর, রাসূলের আনুগত্য কর এবং তোমাদের মধ্য থেকে যে উলিল আমর তার আনুগত্য কর।’ (নিসা-৫৯)

‘যে ব্যক্তি আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের আনুগত্য করবে, আল্লাহ তাকে এমন জান্নাতে দাখিল করবেন যার নিম্নদেশ হতে ঝর্ণাধারা প্রবাহিত হতে থাকবে এবং তারা অনন্তকাল তাতে অবস্থান করবে। আর প্রকৃতপক্ষে ইহাই হচ্ছে বিরাট সফলতা।’ (নিসা ১৩)

‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য করবে সে ওইসব লোকের সঙ্গী হবে যাদের প্রতি আল্লাহতায়ালা নেয়ামত দান করেছেন।’ (নিসা ৬৯)

‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে এবং আল্লাহকে ভয় করে এবং তাঁর নাফরমানী হতে দূরে থাকে এসব লোকই সফলকাম হবে।’ (নূর ৫২)

‘হে নবী, বলে দিন কসম খেয়ে আনুগত্য প্রমাণের তো কোন প্রয়োজন নেই। আনুগত্যের ব্যাপারটা তো খুবই পরিচিত ব্যাপার। সন্দেহ নেই আল্লাহ তোমাদের আমল সম্পর্কে অবগত আছেন।’ (নূর ৫৩)

আনুগত্য সম্পর্কে হাদীস : হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘শাসক যে পর্যন্ত কোন পাপকার্যের আদেশ না করবে, সে পর্যন্ত তার আদেশ শোনা ও মেনে নেয়া প্রতিটি মুসলমানের অবশ্য কর্তব্য, তা তার পছন্দ হোক আর নাই হোক। হ্যা সে যদি কোন পাপকার্যের আদেশ করে তাহলে তার কথা শোনা বা তার আনুগত্য করার কোন প্রয়োজন নেই।’ (বুখারী, মুসলিম)

হযরত আলী (রা.) বলেন, নবী করীম (সা.) বলেছেন, ‘গোনাহের কাজে কোন আনুগত্য নেই, আনুগত্য শুধু নেক কাজের ব্যাপারে।’ (বুখারী, মুসলিম)

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে আমার এতায়াত বা আনুগত্য করল সে আল্লাহরই আনুগত্য করল। আর যে আমার হুকুম অমান্য করল সে আল্লাহর হুকুমই অমান্য করল। যারা আমীরের আনুগত্য করল তারা আমার আনুগত্য করল। আর যারা আমীরের আদেশ অমান্য করল সে প্রকৃতপক্ষে আমারই আদেশ অমান্য করল।’ (বুখারী, মুসলিম)

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) রাসূলে পাক (সা.) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, যে ব্যক্তি আনুগত্যের বন্ধন থেকে হাত খুলে নেয়, সে কিয়ামতের দিন আল্লাহর সম্মুখে এমন অবস্থায় হাজির হবে যে, আত্মপক্ষ সমর্থনে তার বলার কিছুই থাকবে না। আর যে ব্যক্তি বাইয়াত ছাড়া মারা যাবে তার মৃত্যু হবে জাহিলিয়াতের মৃত্যু।’ (মুসলিম)

‘স্রষ্টার অবাধ্যতায় সৃষ্টির কোনো আনুগত্য নেই।’

 

৪/ পিতা-মাতার আনুগত্য ও তার সীমাঃ

Luqman 31:14

وَوَصَّيْنَا ٱلْإِنسَٰنَ بِوَٰلِدَيْهِ حَمَلَتْهُ أُمُّهُۥ وَهْنًا عَلَىٰ وَهْنٍ وَفِصَٰلُهُۥ فِى عَامَيْنِ أَنِ ٱشْكُرْ لِى وَلِوَٰلِدَيْكَ إِلَىَّ ٱلْمَصِيرُ 

আর আমি মানুষকে তার মাতাপিতার ব্যাপারে (সদাচরণের) নির্দেশ দিয়েছি। তার মা কষ্টের পর কষ্ট ভোগ করে তাকে গর্ভে ধারণ করে। আর তার দুধ ছাড়ানো হয় দু’বছরে; সুতরাং আমার ও তোমার পিতা-মাতার শুকরিয়া আদায় কর। প্রত্যাবর্তন তো আমার কাছেই।


Luqman 31:15

وَإِن جَٰهَدَاكَ عَلَىٰٓ أَن تُشْرِكَ بِى مَا لَيْسَ لَكَ بِهِۦ عِلْمٌ فَلَا تُطِعْهُمَاۖ وَصَاحِبْهُمَا فِى ٱلدُّنْيَا مَعْرُوفًاۖ وَٱتَّبِعْ سَبِيلَ مَنْ أَنَابَ إِلَىَّۚ ثُمَّ إِلَىَّ مَرْجِعُكُمْ فَأُنَبِّئُكُم بِمَا كُنتُمْ تَعْمَلُونَ 

আর যদি তারা তোমাকে আমার সাথে শিরক করতে জোর চেষ্টা করে, যে বিষয়ে তোমার কোন জ্ঞান নেই, তখন তাদের আনুগত্য করবে না এবং দুনিয়ায় তাদের সাথে বসবাস করবে সদ্ভাবে। আর অনুসরণ কর তার পথ, যে আমার অভিমুখী হয়। তারপর আমার কাছেই তোমাদের প্রত্যাবর্তন। তখন আমি তোমাদেরকে জানিয়ে দেব, যা তোমরা করতে।


৫/ আত্নীয়-স্বজনের সাথে সম্পর্ক ও তার সীমাঃ

আত্নীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে যাবেনা!

 ক. হাদিস: হজরত আনাস (রা.) হতে বর্ণিত। রাসুল (স.) বলেছেন, যে ইচ্ছা করে যে, তার উপার্জন বৃদ্ধি হউক এবং তার মৃত্যু বিলম্বে হক, সে যেন তার আত্মীয়তার বন্ধন অটুট রাখে। (বোখারি, মুসলিম)

খ. হাদিস: হজরত আনাস (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হজরত আবু তালহা আনসারদের মধ্যে খেজুরের সম্পদে সর্বাপেক্ষা ধনী ছিলেন। মসজিদের সম্মুখের বিরহা উদ্যানটি তার কাছে অধিক প্রিয় ছিল। রাসুলুল্লাহ (স.) উক্ত উদ্যানে প্রবেশ করে বিশুদ্ধ পানি পান করতেন। যখন এই আয়াতটি নাজিল হলো, ‘তোমরা যা ভালোবাস, তা ব্যয় না করা পর্যন্ত তোমরা কিছুতেই ধর্ম অর্জন করতে পারবে না।’ আবু তালহা রাসুলুল্লাহ (স.)-এর কাছে এসে বললেন, আমার ধন-সম্পত্তির মধ্যে বিরহা উদ্যানকে আমি অধিক প্রিয় মনে করি। মহান আল্লাহর উদ্দেশ্যে আমি তা দান করলাম। এর পুরস্কার আমি আল্লাহর কাছে আশা করি। আল্লাহর নির্দেশানুসারে একে ব্যয় করুন। হজরত বললেন, ধন্য, ধন্য। এটা মূল্যবান সম্পত্তি। তুমি যা বলেছ, শুনেছি। আশা করি, তোমার আত্মীয়স্বজনের মধ্যে তুমি তা বণ্টন করে দাও। আবু তালহা তার আত্মীয়স্বজন ও চাচাতো ভাইদের মধ্যে বণ্টন করে দিলেন। (বোখারি, মুসলিম)

গ. হাদিস: হজরত আমর বিন আস (রা.) হতে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, আমার পিতার পরিবার আমার প্রতি প্রীতিভাবাপন্ন নয়। আমার বন্ধু আল্লাহ এবং মুমিনদের ভেতর ধার্মিক ব্যক্তি। কিন্তু তাদের সঙ্গে যে আত্মীয়তা আছে, তা আমি হূদ্যতার সঙ্গে রক্ষা করব। (বোখারি, মুসলিম)

ঘ. হাদিস: হজরত আবু হোরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসুল (স.) বলেন, আল্লাহ আত্মীয়তাকে সৃষ্টি করলেন; অতঃপর তিনি বললেন, তুমি কি এতে সন্তুষ্ট নও যে, তোমার বন্ধন যে রক্ষা করে, তার বন্ধন আমি রক্ষা করি: যে ছিন্ন করে, আমি তার বন্ধন ছিন্ন করি। (বোখারি, মুসলিম)।

ঙ. হাদিস: হজরত আবু হোরায়রা (রা.) বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, রেহেম হতে রহমের (দয়ার) উৎপত্তি। আল্লাহ বলেছেন, ‘যে তোমার মন করে, আমিও তার বন্ধন রক্ষা করি এবং যে তোমার বন্ধন ছিন্ন করে, আমি বন্ধন ছিন্ন করি।’ (বোখারি)।

চ. হাদিস: আবু হোরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত। এক ব্যক্তি রাসুল (স.) কে জিজ্ঞেস করল, আমার আত্মীয়স্বজন রয়েছে, তাদের সঙ্গে সদ্ভাব রাখতে চাই, কিন্তু তারা আমার অপকার করে। আমি তাদের প্রতি সদয়, কিন্তু তারা আমার প্রতি নির্দয়। তিনি বললেন, তুমি যেরূপ বলো, তারা যদি তাই করে, তুমি যেন তাদেরকে উত্তপ্ত অঙ্গারের বটিকা দিতেছ এবং তুমি যতদিন এরূপ ব্যবহার কর ততদিন আল্লাহ হতে তোমার সঙ্গে অনবরত একজন সাহায্যকারী থাকবে। (মুসলিম)

ছ. হাদিস: আবু হোরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, তোমাদের আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে কিরূপে আত্মীয়তার বন্ধন রাখতে হয়, তা তোমাদের পূর্বপুরুষদের কাছে হতে শিক্ষালাভ করো, কেননা আত্মীয়তার বন্ধন পরিবারের মধ্যে ভালোবাসার উপায়, ধর্ম বৃদ্ধির উপকরণ এবং মৃত্যু বিলম্ব করার উপায়। (তিরমিজি)

জ. হাদিস: আবু হোরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত। এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (স.) কে বলল, আমার একটি দিনার (স্বর্ণমুদ্রা) আছে। তিনি বললেন, তোমার নিজের জন্য ব্যয় কর। সে বলল, আমার আর একটি দিনার আছে। তিনি বললেন, তোমার সন্তানগণের জন্য তা ব্যয় কর। সে বলল, আমার আর একটি দিনার আছে। তিনি বললেন, তা তোমার স্ত্রীর জন্য ব্যয় কর। সে বলল, আমার আর একটি দিনার আছে। তিনি বললেন, তা তোমার দাস বা খাদেমের জন্য ব্যয় কর। সে বলল, আমার আর একটি দিনার আছে তিনি বললেন, তুমিই এর ব্যয় সম্বন্ধে উত্তম জ্ঞাত আছ। (আবু দাউদ, নাসায়ি)

ঝ. হাদিস: হজরত আয়েশা (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বললেন. রেহেম আরশের সঙ্গে এ বলে ঝুলতেছে, যে আমার সঙ্গে বন্ধন রাখে, আল্লাহ তার সঙ্গে বন্ধন রাখেন এবং যে আমাকে কর্তন করে ফেলে, তিনি তার সঙ্গে বন্ধন কর্তন করে ফেলেন। (বোখারি, মুসলিম)

ঞ. হাদিস: আবু হোরায়রা (রা.) হতে বণিত। তিনি বলেন, কোন দান সর্বাপেক্ষা উৎকৃষ্ট, জিজ্ঞাসিত হয়ে রাসুলুল্লাহ (স.) বললেন, দরিদ্রকে দান। আত্মীয়কে প্রথম দান করো। (আবু দাউদ)

ট. হাদিস: আবু হোরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত। রাসুল (স.) বলেছেন, যে অর্থ তুমি আল্লাহর পথে ব্যয় করো, যে অর্থ দাস-দাসির মুক্তিতে ব্যয় করো, যে অর্থ দরিদ্রের জন্য ব্যয় করো, যে অর্থ পরিবারের জন্য ব্যয় করো, সর্বাপেক্ষা অধিক সওয়াব এ অর্থের যা তুমি পরিবারের জন্য ব্যয় করো। (মুসলিম)

ঠ. হাদিস: হজরত জাবের বিন মোতয়েম (রা.) হতে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ বলেন, যে আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করে, সে বেহেশতে যাবে না। (বোখারি, মুসলিম)

ড. হাদিস: হজরত ইবনে উমর (রা.) হতে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করে চললেই যথেষ্ট হবে না। একবার বন্ধন ছিন্ন হয়ে গেলে পুনরায় তা সংযোগ করাই প্রকৃত স্বজনপ্রীতি। (বোখারি)

ঢ. হাদিস: হজরত আবদুর রহমান বিন আউফ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, আল্লাহ বলেন, ‘আমি রহমান। আমি রহম (আত্মীয়তার বন্ধন) সৃষ্টি করেছি এবং আমার নাম হতে তা বের করেছি। যে তার বন্ধন রাখে, আমিও তার বন্ধন রাখব এবং যে তা কর্তন করে, আমি তাকে ধ্বংস করব।’ (আবু দাউদ)

ণ. হাদিস: হজরত আবু বাকরাহ (রা.) হতে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, বিদ্রোহ ও আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করা ব্যতীত আর অন্য কোনো গোনাহ নেই, যার জন্য আখিরাতে শাস্তি অবধারিত থাকে। তা সত্ত্বেও এ পৃথিবীতে তার শাস্তি হয়। (আবু দাউদ)

ত. হাদিস: হজরত বাহাজ বিন হাকিম (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (স.)কে প্রশ্ন করা হলো, কে সর্বাপেক্ষা উত্তম ব্যবহার পাওয়ার যোগ্য? তিনি বললেন, তোমার আম্মা। তারপর কে? তোমার আম্মা। তারপর কে? তোমার আব্বা। অতঃপর তোমার নিকটতম আত্মীয় এবং তোমার নিকটতম আত্মীয়। (তিরমিজি, আবু দাউদ)

থ. হাদিস: হজরত আবদুল্লাহ বিন সালাম (রা.) হতে বর্ণিত। রাসুল (স.) বললেন, হে মানবগণ! শান্তি স্থাপন করো, খাদ্য প্রদান করো, আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করো। যখন লোক নিদ্রিত থাকে তখন রাত্রিতে নামাজ পড়, তা হলে শান্তির সঙ্গে বেহেশতে যাবে। (তিরমিজি, ইবনে মাজাহ)

দ. হাদিস: হজরত সোলায়মান বিন আমের (রা.) হতে বর্ণিত। রাসুলল্লাহ (স.) বলেছেন, দরিদ্রকে দান করলে এক সওয়াব এবং আত্মীয়কে দান করলে দ্বিগুন সওয়াব হয়। (দান এবং আত্মীয়তা রক্ষা) (তিরমিজি, নাসায়ি, ইবনে মাজাহ)

ধ. হাদিস: হজরত মায়মুনা (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একটি দাসিকে মুক্তি দিয়ে রাসুলুল্লাহ (স.)-এর কাছে ইহা ব্যক্ত করা হলে, তিনি বললেন। তুমি যদি এই অর্থ তোমার খালাকে দিতে তা তোমার অধিকতর সওয়াবের কারণ হতো। (বোখারি, মুসলিম)

ন. হাদিস: হজরত জাবের বিন সামুরাহ (রা.) হতে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, যখন আল্লাহ তোমাদের মধ্যে কোনো ব্যক্তিকে কোনো ধন দেন, সে যেন প্রথমেই নিজের জন্য ও পরিজনবর্গের জন্য ব্যয় করে। (মুসলিম)


৬/ জীবন সঙ্গীর সাথে সম্পর্ক ও তার সীমাঃ

স্বামী ও স্ত্রী মানে বিপরীত লিঙ্গের এমন কিছু যাদের মাঝে আল্লাহ পারস্পরিক শক্তিশালী আকর্ষণ তৈরি করে দিয়েছেন। এই আকর্ষণটা পরিপূর্ণ ভালোবাসা রুপান্তরিত হতে কয়েক বছর সময় লেগে গেলেও তাদের মাঝে আছে পারস্পারিক চুক্তির(বিবাহের) মিল বন্ধন ও ভালোবাসা।


সাধারণত নারী পুরুষের একে অপরের প্রতি বিপরীত লিঙ্গের কারণে একটা আকর্ষণ কাজ করে। অনেকে এই ভালো লাগাকে চর্চা করতে করতে চোখাচোখি, দেখাদেখি, হাতাহাতি এমনকি শারিরীক একটা সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। কিন্তু দেখা যায় কোন ভুল বুঝাবুঝি হলেই দূরত্ব তৈরী হয়। আর যেহেতু তাদের মাঝে শুধু রিলেশন বা সম্পর্ক থাকে। কোন বৈবাহিক চুক্তি না থাকায় ছেলে বা মেয়ে দুইজনের দুই রকম ক্ষতি হয়ে যায়। একরকম ক্ষতি হয় বৈবাহিক চুক্তি না থাকায় গুনাহ।  অন্য ক্ষতি হলো একে অপরকে হারিয়ে মানুষিক যন্ত্রণার মত ক্ষতিতে পড়ে। অনেকে আবার এই যন্ত্রণা সইতে না পেরে পাগল হয়ে যায় কিংবা নিজের বড় ধরনের ক্ষতি করে ফেলে।

তাই নারী পুরুষের সম্পর্ক পূর্ণতা পায় একমাত্র বিয়ের মাধ্যমে। বিয়ের মাধ্যমে যখন সম্পর্কে জড়ায় তখন উভয়ের একে অপরের প্রতি কিছু লিখিত দায়-দায়িত্ব চলে আসে। 

আরেকটা কথা বলে রাখি তা হল দায়িত্ব মানে এমনকিছু যা নিজের ভালো লাগুক বা নাই লাগুক, কিন্তু অন্যের সুবিধার কথা চিন্তা করে তার জন্য ভালো কিছু করা। 

সম্পর্কের ক্ষেত্রে আরেকটা জরুরী বিষয় হল পুরুষ নারী যখন বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয় তখন তারা মাত্র অঙ্গিকার ব্যক্ত করল একসাথে চলার। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল একসাথে চলতে হলে পরস্পর পরস্পরের প্রতি সম্মান, আন্তরিকতা ও ভালোবাসা খুবই প্রয়োজন যা তৈরি হতে সময়ের প্রয়োজন।  এই সময়টা কমপক্ষে ০৩ হতে ০৫ বছর লাগে। হ্যাঁ, আমরা বুঝি আর না-বুঝি, মানি আর না-মানি কমপক্ষে এই সময়টাই লাগে। তাই সংসারের যে কোন কথা কাটাকাটি কিংবা মনোমালিন্যতে ধৈর্য ধরতে হবে। খারাপ বিষয়গুলো হাসি মুখে এড়িয়ে যেতে হবে। ভালো কোন যুক্তি থাকলে মন মেজাজ আর সময় বুঝে উপস্থাপন করতে হবে। কোন ভাবেই মনোমালিন্য, হানাহানি ইত্যাদি সুযোগ সৃষ্টি হতে বহু দূরে থাকা চাই। নিম্নে পরিবারের লক্ষ্য দেওয়া হলঃ


ক/ পরিবার ব্যবস্থাঃ

 আদর্শ পরিবার হল সেই পরিবার যে পরিবারে স্বামী অভিভাবক ও উপার্জনকারী আর স্ত্রী অনুগত ও রক্ষণাবেক্ষণকারী।

(পুরুষেরা নারীদের উপর তত্ত্বাবধানকারী ও ভরণপোষণকারী, যেহেতু আল্লাহ তাদের মধ্যে একের উপর অপরকে বৈশিষ্ট্য দান করেছেন এবং এই হেতু যে, তারা স্বীয় ধন সম্পদ হতে তাদের জন্য ব্যয় করে থাকে; সুতরাং যে সমস্ত নারী পুণ্যবতী তারা আনুগত্য করে, আল্লাহর সংরক্ষিত প্রচ্ছন্ন বিষয় (অর্থাৎ তাদের সতীত্ব ও স্বামীর সম্পদ) সংরক্ষণ করে; যদি নারীদের অবাধ্যতার আশংকা হয় তাহলে তাদেরকে সদুপদেশ প্রদান কর, তাদেরকে শয্যা হতে পৃথক কর এবং তাদেরকে প্রহার কর; অনন্তর যদি তারা তোমাদের অনুগত হয় তাহলে তাদের জন্য অন্য পন্থা অবলম্বন করনা; নিশ্চয়ই আল্লাহ সমুন্নত, মহা মহীয়ান।) 


খ/ সমাজে যেনা-ব্যাবিচার না থাকাঃ

 নারী মাহরম ব্যাতিত ঘরের বাহিরে নিরাপদ নয়। নারী কর্মক্ষেত্রে তার সারাজীবনে অনেক খারাপ অভিজ্ঞতা দিয়ে যায়। পশ্চিমা নারীরা প্রায়ই অভিযোগ করে যৌন হয়রানির।  আর কোন নারী যদি নিজেও  পুরুষদের প্রতি খারাপ দৃষ্টি থাকে। তাহলে ঐ নারী চাইবে পুরুষের সঙ্গে কর্মস্থল হউক। এতে তার যৌন চাহিদা অবৈধ উপায়ে মিটিয়ে নিবেন। 

গ/ পুরুষের মর্যাদাঃ

 উপার্জন যে করবে সেই শ্রেষ্ঠ। আর এই দায়িত্ব নিয়ে পুরুষ ঘরে বসে থাকবেনা। কিংবা রিযিকের সংকোচনের কারণে পুরুষ ধৈর্য হারা হয়ে নারীকে কর্মস্থলে বের করে দিবেনা। নারীদের ঘরে বসিয়ে সম্মানের সহিত খাওয়ানো ও সম্মানজনক আচরণ করা পুরুষের দায়িত্ব ও মর্যাদার প্রতিফলন। 

নারীদের তেমনি ন্যায়সঙ্গত অধিকার আছে যেমন আছে তাদের উপর পুরুষদের। কিন্তু নারীদের উপর পুরুষের মর্যাদা আছে। আল্লাহ মহাপরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। (সূরা বাকারা (২) : ২২৮)

ঘ/ পৃথিবীতে সন্তান সন্ততি রেখে যাওয়াঃ 

নারীকে সুন্দর একটা ঘরোয়া পরিবেশ না দিলে ঘরে নারী স্বাধীনতা নষ্ট হবে। আর নারীও ধৈর্য হারা হয়ে ঘর হতে বাহির বের হয়ে আসবে। তাহলে নারী তার যে সন্তান উৎপাদনের সক্ষমতা আছে তা সেই ঝামেলা মনে করবে। নারী সন্তান উৎপাদন না করলে পৃথিবীতে মানুষের অস্তিত্ব রক্ষা হবে আর কিভাবে?!!! অথচ হাদিসে বলা হয়েছে দুই বৈশিষ্ট্য দেখে নারী বিবাহ করতে এক হল অধিক প্রেমময়ী ও অধিক সন্তানদাত্রী।


৭/ প্রতিবেশীর সাথে সম্পর্ক ও তার সীমাঃ

হযরত হাসান (র) থেকে বর্ণিত, তাঁকে প্রতিবেশী সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেছেন, নিজ ঘর হতে সম্মুখের চল্লিশটি, পশ্চাতের চল্লিশটি, ডান পাশের চল্লিশটি ও বাম পাশের চল্লিশটি যাদের ঘর রয়েছে এরাই প্রতিবেশী। প্রতিবেশীর প্রতি আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য কি? বিপদে আপদে অতি সহজে সহযোগিতার হাত বাড়ানোর একমাত্র কাছের লোক হলো প্রতিবেশী। তাই তাদের প্রতি আমাদের কিছু দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে।

হাদিসে এসেছে আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ- নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, আল্লাহর কসম! সে ব্যক্তি মু’মিন নয়। আল্লাহর কসম! সে ব্যক্তি মু’মিন নয়। আল্লাহর কসম! সে ব্যক্তি মু’মিন নয়। জিজ্ঞেস করা হল, ‘কোন্ ব্যক্তি? হে আল্লাহর রসূল!’ তিনি বললেন, যে লোকের প্রতিবেশী তার অনি থেকে নিরাপদে থাকে না।

মুসলিমের এক বর্ণনায় আছে, ঐ ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না, যার অনি থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদে থাকে না। (বুখারী ৬০১৬, মুসলিম ১৮১ নং)


রাসূল (সা) বলেছেন, যদি কোনো মুসলমান ব্যক্তি অপর কোনো মুসলমানের দোষ গোপন করে তাহলে আল্লাহ কেয়ামতের দিন সেই ব্যক্তির দোষ গোপন করবেন।


কুরআনুল কারিমে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন, এবং তোমরা আল্লাহরই ইবাদাত কর এবং তাঁর সাথে কোন বিষয়ে অংশীদার স্থাপন করনা; এবং মাতা-পিতার সাথে সদ্ব্যবহার কর এবং আত্মীয়-স্বজন, পিতৃহীন, দরিদ্র, সম্পর্কবিহীন প্রতিবেশী, পার্শ্ববতী সহচর ও পথিক এবং তোমাদের দাস-দাসীদের সাথেও সদ্ব্যবহার কর; নিশ্চয়ই আল্লাহ অহংকারী আত্মাভিমানীকে ভালবাসেননা। (সুরা নিসা: ৩৬)


হাদিসে এসেছে হযরত আবূ শুরায়হ খুযায়ী (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ- নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি বিশ্বাস রাখে, সে যেন প্রতিবেশীর সাথে সদ্ব্যবহার করে। যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি বিশ্বাস রাখে, সে যেন তার মেহেমানের খাতির করে। এবং যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস রাখে, সে যেন ভাল কথা বলে, অথবা নীরব থাকে। (মুসলিম ১৮৫ নং, কিছু শব্দ বুখারীর)


৮/ বন্ধু নির্বাচনঃ 

'জালিম সেদিন নিজের দুই হাত দংশন করতে করতে বলবে, হায় দুর্ভাগ্য, আমি যদি অমুককে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করতাম।’ (সুরা : ফুরকান, আয়াত : ২৮)


বন্ধু নির্বাচনে ইসলামের নির্দেশনা
Share

অ+অ-

‘জালিম সেদিন নিজের দুই হাত দংশন করতে করতে বলবে, হায় দুর্ভাগ্য, আমি যদি অমুককে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করতাম।’ (সুরা : ফুরকান, আয়াত : ২৮)

ইসলামে বন্ধুত্বের সম্পর্কটা গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়। পার্থিব এই জীবনে মূলত সে-ই বেশি সুখী, যার ভালো বন্ধুর সংখ্যা বেশি। বন্ধুত্ব আমাদের একাকিত্বকে যেমন ভুলিয়ে দেয়, ঠিক তেমনি জীবনটাকেও আনন্দে পরিপূর্ণ করে। যেকোনো মানুষকে চেনা যায় তার বন্ধু কেমন তার মাধ্যমেই, বিপদে যে এগিয়ে আসে, দেখা হলে মহান আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, ভুলত্রুটি যে সংশোধন করে, সে-ই তো প্রকৃত বন্ধু। তাই আমাদের জীবনে যেমন চরিত্রবান বন্ধু প্রয়োজন, ঠিক তেমনি আমাদের ছেলে-মেয়েদের বিকাশের জন্যও প্রয়োজন সৎ ও চরিত্রবান বন্ধু নির্বাচন। বন্ধুর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য আমাদের সব সময় প্রভাবিত করে। আমাদের যাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে হবে এবং যাদের বর্জন করতে হবে, সে ব্যাপারে মহান আল্লাহ পাক এবং রাসুল (সা.) আমাদের পথ দেখিয়েছেন। এমনকি নিজের বাবা ও ভাই যদি অবিশ্বাসী হয়, তাহলে তাদের সঙ্গেও বন্ধুত্ব না রাখার আদেশ এসেছে। এই মর্মে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজ পিতা ও ভাইদের অন্তরঙ্গ বন্ধুরূপে গ্রহণ কোরো না, যদি তারা ঈমান অপেক্ষা কুফরকে ভালোবাসে।’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ২৩)

কোরআনের অন্যত্র এসেছে, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা মুসলমানদের বাদ দিয়ে কাফিরদের বন্ধু বানিয়ো না। তোমরা কি এমনটা করে নিজের ওপর আল্লাহর প্রকাশ্য দলিল কায়েম করে দেবে।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ১৪৪) আবার অন্য ধর্মের লোকদের সঙ্গেও বন্ধুত্ব গ্রহণে ইসলাম সম্পূর্ণ নিষেধ করেছে, মূলত তারা একে অপরের বন্ধু। এই মর্মে ইরশাদ হচ্ছে, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা ইহুদি ও খ্রিস্টানদের বন্ধু হিসেবে গ্রহণ কোরো না। তারা একে অপরের বন্ধু। তোমাদের মধ্যে যে তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করবে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত হবে। আর আল্লাহ জালিমদেরকে পথ প্রদর্শন করেন না।’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ৫১) একজন ঈমানদার যদি ঈমানদার ছাড়া অন্য কারো সঙ্গে বন্ধুত্ব করে, তাহলে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়। এই মর্মে ইরশাদ হচ্ছে, ‘মুমিনগণ যেন অন্য মুমিনকে ছেড়ে কোনো কাফিরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করে। যারা এরূপ করবে আল্লাহর সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক থাকবে না।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ২৮)

আমরা যদি মহান আল্লাহকে আমাদের জীবনে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করতে পারি, তাহলে কোনো ভয় বা চিন্তা আমাদের জীবনে আসবে না। এ ব্যাপারে মহান আল্লাহ তাঁর কালামে পাকে ঘোষণা দিয়েছেন, ‘মনে রেখো, যারা আল্লাহর বন্ধু, তাদের কোনো ভয়ভীতি নেই, তাদের কোনো চিন্তাও নেই।’ (সুরা : ইউনুস, আয়াত : ৬২)



‘জালিম সেদিন নিজের দুই হাত দংশন করতে করতে বলবে, হায় দুর্ভাগ্য, আমি যদি অমুককে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করতাম।’ (সুরা : ফুরকান, আয়াত : ২৮)

ইসলামে বন্ধুত্বের সম্পর্কটা গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়। পার্থিব এই জীবনে মূলত সে-ই বেশি সুখী, যার ভালো বন্ধুর সংখ্যা বেশি। বন্ধুত্ব আমাদের একাকিত্বকে যেমন ভুলিয়ে দেয়, ঠিক তেমনি জীবনটাকেও আনন্দে পরিপূর্ণ করে। যেকোনো মানুষকে চেনা যায় তার বন্ধু কেমন তার মাধ্যমেই, বিপদে যে এগিয়ে আসে, দেখা হলে মহান আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, ভুলত্রুটি যে সংশোধন করে, সে-ই তো প্রকৃত বন্ধু। তাই আমাদের জীবনে যেমন চরিত্রবান বন্ধু প্রয়োজন, ঠিক তেমনি আমাদের ছেলে-মেয়েদের বিকাশের জন্যও প্রয়োজন সৎ ও চরিত্রবান বন্ধু নির্বাচন। বন্ধুর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য আমাদের সব সময় প্রভাবিত করে। আমাদের যাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে হবে এবং যাদের বর্জন করতে হবে, সে ব্যাপারে মহান আল্লাহ পাক এবং রাসুল (সা.) আমাদের পথ দেখিয়েছেন। এমনকি নিজের বাবা ও ভাই যদি অবিশ্বাসী হয়, তাহলে তাদের সঙ্গেও বন্ধুত্ব না রাখার আদেশ এসেছে। এই মর্মে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজ পিতা ও ভাইদের অন্তরঙ্গ বন্ধুরূপে গ্রহণ কোরো না, যদি তারা ঈমান অপেক্ষা কুফরকে ভালোবাসে।’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ২৩)

কোরআনের অন্যত্র এসেছে, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা মুসলমানদের বাদ দিয়ে কাফিরদের বন্ধু বানিয়ো না। তোমরা কি এমনটা করে নিজের ওপর আল্লাহর প্রকাশ্য দলিল কায়েম করে দেবে।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ১৪৪) আবার অন্য ধর্মের লোকদের সঙ্গেও বন্ধুত্ব গ্রহণে ইসলাম সম্পূর্ণ নিষেধ করেছে, মূলত তারা একে অপরের বন্ধু। এই মর্মে ইরশাদ হচ্ছে, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা ইহুদি ও খ্রিস্টানদের বন্ধু হিসেবে গ্রহণ কোরো না। তারা একে অপরের বন্ধু। তোমাদের মধ্যে যে তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করবে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত হবে। আর আল্লাহ জালিমদেরকে পথ প্রদর্শন করেন না।’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ৫১) একজন ঈমানদার যদি ঈমানদার ছাড়া অন্য কারো সঙ্গে বন্ধুত্ব করে, তাহলে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়। এই মর্মে ইরশাদ হচ্ছে, ‘মুমিনগণ যেন অন্য মুমিনকে ছেড়ে কোনো কাফিরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করে। যারা এরূপ করবে আল্লাহর সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক থাকবে না।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ২৮)

আমরা যদি মহান আল্লাহকে আমাদের জীবনে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করতে পারি, তাহলে কোনো ভয় বা চিন্তা আমাদের জীবনে আসবে না। এ ব্যাপারে মহান আল্লাহ তাঁর কালামে পাকে ঘোষণা দিয়েছেন, ‘মনে রেখো, যারা আল্লাহর বন্ধু, তাদের কোনো ভয়ভীতি নেই, তাদের কোনো চিন্তাও নেই।’ (সুরা : ইউনুস, আয়াত : ৬২)

 
আর বন্ধুত্ব তার সঙ্গেই করতে হবে, যার আছে আল্লাহর ওপর অগাধ বিশ্বাস। এ ব্যাপারে কোরআনে কারিমে ইরশাদ হচ্ছে, ‘আর ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার নারী একে অপরের বন্ধু। তারা ভালো কথা শিক্ষা দেয় এবং মন্দ থেকে বিরত রাখে, নামাজ প্রতিষ্ঠা করে, জাকাত দেয় এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের নির্দেশ অনুযায়ী জীবন যাপন করে। এদেরই ওপর আল্লাহ তাআলা দয়া করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রমশীল, সুকৌশলী।’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ৭১)

বন্ধুত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে মনীষীদেরও দিকনির্দেশনা রয়েছে, ইমাম গাজ্জালি (রহ.) কারো সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে হলে তিনটি গুণের দিকে লক্ষ রাখার কথা বলেছেন—১. নেককার ও পুণ্যবান, ২. চরিত্রবান, ৩. জ্ঞানী ও বিচক্ষণ।

হজরত ইমাম জয়নুল আবেদিন তাঁর ছেলে ইমাম মুহাম্মদ আল-বাকিকে উপদেশ দিতে গিয়ে পাঁচ ধরনের মানুষের সঙ্গে বন্ধু নির্বাচন করতে নিষেধ করেছেন—

১. মিথ্যাবাদী, ২. পাপী, ৩. কৃপণ, ৪. বোকা ও আর ৫. যারা স্বজনদের সঙ্গে প্রতারণা করে।

আমাদের প্রত্যেকেরই বন্ধুত্ব করতে হবে পরকালের কল্যাণে মহান আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার নিমিত্তেই। তাই পরকালের কল্যাণের জন্য এই দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ বন্ধু নির্বাচন করতে হবে পরিপূর্ণ ঈমানদার দেখে। এ ব্যাপারে কোরআনের নির্দেশ এসেছে, ‘তোমাদের বন্ধু তো আল্লাহ ও তাঁর রাসুল এবং মুমিনগণ—যারা নামাজ কায়েম করে, জাকাত দেয় এবং বিনম্র।’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ৫৫)

আপনি যার সঙ্গে চলছেন সেই বন্ধুটি ভালো না খারাপ তা নির্ণয় করার কষ্টিপাথর আপনার কাছেই আছে। আসলে কারো সঙ্গে চলার পর যদি ভালো গুণ আপনার ভেতরে আসতে থাকে, তাহলে মনে করতে হবে সে আপনার ভালো বন্ধু। অন্যদিকে যদি খারাপ কিছু আসতে থাকে, তাহলে যত দ্রুত সম্ভব সেই বন্ধু ত্যাগ করে একাকী জীবন কাটানো এবং ভালো বন্ধু খুঁজে বের করাই বুদ্ধিমানের কাজ।

তাই বন্ধু নির্বাচনে আমাদের বেশ সতর্ক হতে হবে। আমাদের বন্ধুত্ব করতে হবে একমাত্র মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। এ জগতে যারা চরিত্রবান, দয়াবান, দেখা হলেই যারা আমাদের মহান আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, যারা সব সময় আমাদের দোষ না খুঁজে বরং সংশোধন করে দেয়, তাদের সঙ্গে আমাদের বন্ধুত্বের বন্ধন অটুট থাকুক সারাটা জীবন। আমরা আমাদের জীবনে রাসুলে পাক (সা.)-এর হাদিসটি অনুসরণের মাধ্যমে বন্ধুত্ব করে ঈমান পরিপূর্ণ করতে পারি— ‘যে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কাউকে ভালোবাসে এবং আল্লাহর উদ্দেশ্যে ঘৃণা করে, আল্লাহর উদ্দেশ্যে দান করে কিংবা না করে, সে তার ঈমান পূর্ণ করে নিল।’ (আবু দাউদ)



৯/ অন্যান্যদের সাথে সম্পর্ক ও তার সীমাঃ 

উপরের বিষয়গুলো বাদ দিলে আর থাকে সাধারণত মানষ। এই মানুষকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। ঈমানদার ও কাফের। 

ইসলামের নির্দেশ হল ঈমানদার ভাই ভাই। তাদের বন্ধু হিসেবেই নিতে হবে। 

মু’মিন পুরুষ আর মু’মিন নারী পরস্পর পরস্পরের বন্ধু, তারা সৎকাজের নির্দেশ দেয়, অন্যায় কাজ থেকে নিষেধ করে, নামায ক্বায়িম করে, যাকাত দেয়, আল্লাহ ও তাঁর রসূলের আনুগত্য করে। তাদের প্রতিই আল্লাহ করুণা প্রদর্শন করবেন। আল্লাহ তো প্রবল পরাক্রান্ত, মহা প্রজ্ঞাবান। (সূরা তওবা ৭১)

মুমিনরা পারস্পরিক দয়া, ভালোবাসা ও সহানুভূতির ক্ষেত্রে একটি দেহের মতো। যখন দেহের কোনো একটি অঙ্গ কষ্ট অনুভব করে তখন তার জন্য গোটা দেহই অনিদ্রা ও জ্বরে আক্রান্ত হয়ে থাকে।’ (বুখারি ও মুসলিম) এই ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য মহানবী (সা.)-এর দিকনির্দেশনা হলো, ‘তোমরা পরস্পর হিংসা কোরো না, বিদ্বেষ পোষণ কোরো না, একজন অন্যজনের পেছনে লেগে থেকো না। একে অন্যের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ কোরো না। আর আল্লাহর বান্দারা—তোমরা পরস্পর ভাই ভাই হয়ে যাও। এক মুসলিম অন্য মুসলিমের ভাই। সে তার ওপর অত্যাচার করে না। তাকে অপদস্থ করে না। তাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে না।’ (বুখারি ও মুসলিম)

 আর কাফের হল শত্রু। তাদের শত্রু হিসেবে নিয়ে সতর্কতার সহিত তাদের সাথে পথ চলতে হবে।

মুমিনরা যেন মুমিনদের ছাড়া কাফিরদেরকে বন্ধু না বানায়। আর যে কেউ এরূপ করবে, আল্লাহর সাথে তার কোন সম্পর্ক নেই। তবে যদি তাদের পক্ষ থেকে তোমাদের কোন ভয়ের আশঙ্কা থাকে। আর আল্লাহ তোমাদেরকে তাঁর নিজের ব্যাপারে সতর্ক করছেন এবং আল্লাহর নিকটই প্রত্যাবর্তন। আলে ইমরান ২৮

হে মু’মিনগণ! তোমরা তোমাদের নিজেদের লোক ছেড়ে অন্য কাউকেও বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না, কারণ তারা তোমাদেরকে নষ্ট করতে ত্রুটি করবে না, তারা কেবল তোমাদের দুর্ভোগ কামনা করে, বস্তুতঃ তাদের মুখেও শত্রুতা প্রকাশিত হয়ে পড়ে এবং তাদের অন্তর যা লুকিয়ে রাখে তা আরও ভয়ঙ্কর, আমি তোমাদের কাছে তাদের লক্ষণগুলো স্পষ্ট করে দিলাম, যদি তোমরা অনুধাবন কর। আলে ইমরান ১১৮

হে মুমিনগণ, তোমরা মুমিনগণ ছাড়া কাফিরদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। তোমরা কি আল্লাহর জন্য তোমাদের বিপক্ষে কোন স্পষ্ট দলীল সাব্যস্ত করতে চাও? ১৪৪নিসা

হে মু’মিনগণ! তোমরা ইয়াহুদী ও খৃষ্টানদেরকে বন্ধু রূপে গ্রহণ করনা, তারা পরস্পর বন্ধু; আর তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি তাদের সাথে বন্ধুত্ব করবে নিশ্চয়ই সে তাদেরই মধ্যে গণ্য হবে; নিশ্চয়ই আল্লাহ অত্যাচারী সম্প্রদায়কে সুপথ প্রদর্শন করেননা। মায়েদা ৫১

হে মু’মিনগণ! তোমরা নিজেদের পিতাদেরকে ও ভাইদেরকে বন্ধু রূপে গ্রহণ করনা যদি তারা ঈমানের মুকাবিলায় কুফরকে প্রিয় মনে করে; আর তোমাদের মধ্য হতে যারা তাদের সাথে বন্ধুত্ব রাখবে, বস্তুতঃ ঐ সব লোকই হচ্ছে বড় অত্যাচারী। তাওবা ২৩

নাবী ও অন্যান্য মু’মিনদের জন্য জায়েয নয় যে, তারা মুশরিকদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে, যদিও তারা আত্মীয়ই হোক না কেন, এ কথা প্রকাশ হবার পর যে, তারা জাহান্নামের অধিবাসী। তাওবা ১১৩

আল্লাহ আমাদের সম্পর্কগুলো বুঝে সঠিক পথে চলবো। সেই তৌফিক কামনা করছি। 


###***০৭ আয়াত***###

আর তোমার রাব্ব এমন নন যে, জনপদসমূহকে অন্যায়ভাবে ধ্বংস করবেন, অথচ ওর অধিবাসীরা সৎ কাজে লিপ্ত রয়েছে। (Hud 11:117)



শয়তান তোমাদেরকে অভাবের ভীতি প্রদর্শন করে এবং তোমাদেরকে অশ্লীলতার আদেশ করে এবং আল্লাহ তোমাদেরকে তাঁর নিকট হতে ক্ষমা ও দয়ার অংগীকার করেন। আল্লাহ হচ্ছেন বিপুল দাতা, সর্বজ্ঞ। (Al-Baqarah 2:268)


এবং নিশ্চয়ই আমি তোমাদেরকে ভয়, ক্ষুধা, ধন, প্রাণ এবং ফল-ফসলের দ্বারা পরীক্ষা করব; এবং ঐ সব ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ প্রদান কর। (Al-Baqarah 2:155)

'হে ইমানদারগণ! তোমরা ধৈর্য ধারণ করো, ধৈর্যের প্রতিযোগিতা করো এবং যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকো, আল্লাহকে ভয় করো যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো। ' (সুরা-৩ আল ইমরান, আয়াত: ২০০)


যদি তোমাদের আঘাত লেগে থাকে তাহলে নিশ্চয়ই সেই সম্প্রদায়েরও তদ্রুপ আঘাত লেগেছে, এবং এই দিনসমূহকে আমি মানবগণের মধ্যে পরিক্রমণ করাই; এবং যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছে তাদেরকে আল্লাহ এই রূপে প্রকাশ করেন; এবং তোমাদের মধ্য হতে কতককে শহীদ রূপে গ্রহণ করবেন, আর আল্লাহ অত্যাচারীদেরকে ভালবাসেননা। (Aal-e-Imran 3:140)


কোন নাবীর পক্ষে তখন পর্যন্ত বন্দী (জীবিত) রাখা শোভা পায়না, যতক্ষণ পর্যন্ত ভূ-পৃষ্ঠ (দেশ) হতে শক্র বাহিনী নির্মূল না হয়, তোমরা দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী সম্পদ কামনা করছ, অথচ আল্লাহ চান তোমাদের পরকালের কল্যাণ, আল্লাহ মহা পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। (Al-Anfal 8:67)


"আল্লাহ তাঁর বান্দাদেরকে জীবনোপকরণের প্রাচুর্য দিলে তারা পৃথিবীতে অবশ্যই বিপর্যয় সৃষ্টি করত; কিন্তু তিনি তাঁর ইচ্ছা মত সঠিক পরিমানেই দিয়ে থাকেন। তিনি তাঁর বান্দাদেরকে সম্যক জানেন ও দেখেন।" (Ash-Shura 42:27)





Post a Comment

0 Comments